ইতিহাসের চোখে ‘‘চুয়াডাঙ্গা’’

১২ ফেব্রুয়ারী ২০২০ ০৯:৫৫:১১
ইতিহাসের চোখে ‘‘চুয়াডাঙ্গা’’


 মেহেদী হাসান

 চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:


প্রাচিন কাল থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নাম বা তার সুনাম কিংবা অতিথি আপ্যায়ন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন   ও গৌরবের সনাম দেশের ভেতরে এবং বহির্বিশেষ ছড়িয়ে আছে। বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনীতে তার নিদর্শন আছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা স্থানের সে সব কাহিনী পড়ে মুগ্ধ হলেও বইপত্রে কোথাও আমরা চুয়াডাঙ্গার উল্লেখ পাই না। তাই চুয়াডাঙ্গা সম্পর্কে ইতিহাসের কিছু খোঁজ-খবর নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবারের প্রতিবেদন  ‘’ইতিহাসের চোখে ‘‘চুয়াডাঙ্গা’’


বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলের নদ-নদী বহুল ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরবর্তী বিশাল ভূখন্ড নিয়ে নদীয়া জেলা গঠিত। নদীয়ার ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য ছাড়াও শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে সারা ভারতবর্ষের একটি আলাদা গুরুত্ব বহুকাল ধরে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এর ভৌগোলিক, প্রাকৃতিক,নৃ তাত্ত্বিক, জীবন-জীবিকা, কৃষিউৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা বাণিজ্যঅর্থনৈতিক চলন, ভাষা ও সংস্কৃতির বিন্যাস এবং বিভাজন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এসেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে সারা ভারতবর্ষে নদীয়া একটি আলাদা ঐতিহ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। নদীয়াকে কেন্দ্র করে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সেন যুগের শাসনামলে [১০৯৭-১২২৩] ও ১২০৪ সাল থেকে মুসলিমশা সনামলের কয়েক শতাব্দী এবং ১৭৫৭ সালে ইংরেজ অধিকার বিস্তৃত হওয়ার পরেও শিক্ষাসংস্কৃতি-সমাজ-সভ্যতা ইতিহাস নানা বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় প্রাণাবেগে সঞ্জীবিতহ য়ে তার আত্ম-স্বাতন্ত্র্য অর্জন ও আত্মপ্রকাশের এক বিস্ময়কর সুযোগ লাভ করে। এছাড়াও শিক্ষাশিল্পনৈপুণ্য, কুটির শিল্প, মৃৎশিল্প, তাঁত শিল্প, ব্যবসাবাণিজ্যবিদেশী বণিকদের আগমণ,পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার, সাহিত্যসংগীত, নাট্যচর্চার একটি সুদূর প্রসারী প্রভাব বৃহত্তর নদীয়ার মানুষের জীবনধারার সাথে জড়িয়ে আছে। অবিভক্ত নদীয়া জেলা ছিল বাঙালি সংস্কৃতির প্ৰাণকেন্দ্র। বৃহত্তর নদীয়ার অংশ হিসাবে চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ জনপদ সেই গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশের জেলাসমূহ গঠনের প্রাক্কালে বিশেষভাবে যেসব উপাদানের উপর ভিত্তি করে সমন্বিত সত্ত্বা হিসেবে বিকশিত হয়ে ওঠে সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছিল।।জেলার মহকুমাসমূহ গঠনের সময়ে সেই একই পদ্ধতি অনুসৃত হয়। তারই ফলশ্রুতি পরবর্তীকালে বহু যুগ ধরে সেই জনপদ । তার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। নদীয়া জেলাকে কেন্দ্র করে যেমন বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক। নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্যের (১৪৮৬-১৫৩৩] আবির্ভাব, ঘোষপাড়ার সতী মা, চাপড়ার বৃত্তিহুদায় সাহেবধনী সম্প্রদায়, মেহেরপুরে বলাহাড়ি সম্প্রদায়, ছেউড়িয়ায় বাউল সাধক লালন শাহ [১৭৭৮-১৮৯০], আলমডাঙ্গার মধুপুরের কুবির গোঁসাই [১৭৮৭-১৮৭৯] প্ৰমূখ লোকধর্মের সাধকগণের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজে লোকায়ত জীবনযাপন এবং অন্তশ্চেতনাময় মুক্ত ভাবনা বৃহত্তর লোকসমাজে যেমন মান্যতা পায়, তেমনি নাগরিক সমাজের জ্ঞানীগুণী মানুষের ও বিদ্যার্থীদের সমাবেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিস্তার এক ভিন্ন স্বরূপের প্রকাশ ঘটিয়েছিল।


বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলা ব্রিটিশ শাসনামলে অবিভক্ত বাংলার অন্যতম জেলা নদীয়ার মহকুমা ছিল। বাংলাদেশের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সম্ভবত সবচেয়ে অর্বাচীন শহর। নবাব আলিবর্দি খানের (১৭৪০-১৭৫৬) আমলে চুয়াডাঙ্গায় প্রথম জনবসতির সূচনা হয়। ১৭৪০ থেকে ৫০ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে । নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ সীমান্তবর্তী ইটেবাড়ি-মহারাজপুর গ্রামাঞ্চল থেকে ’চুঙো মল্লিক' নামে এক ব্যক্তি সপরিবারে ভৈরব নদী হয়ে মাথাভাঙা নদী পথে নদীর ধারে নির্জন উচু জায়গা দেখে সেখানে বসতি গড়ে তোলেন। তাঁর সঙ্গে ছিল স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এভাবেই চুয়াডাঙ্গা গ্রামের পত্তন হয়। চুয়াডাঙ্গার পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে গেছে নবগঙ্গা নদী। মধ্যবর্তী স্বল্প জায়গাটুকুই চুয়াডাঙ্গার মূলভূখন্ড। ১৭৯৭ সালের ফারসি রেকর্ডপত্রে জনপদটি ’চুসোডাঙ্গা নামে নথিভুক্ত হতে দেখা যায়। ফারসি থেকে ইংরেজিতে লেখার সময়ে চুসোডাঙ্গা চুয়াডাঙ্গা' হয়ে গেছে। আজ থেকে ৫০/৬০ বছর আগেও বহু বয়স্ক মানুষের মুখে চুয়াডাঙ্গাকে 'চুঙ্গোডাঙ্গা বলতে শোনা যেত।


১৮৫৬ সালে সমগ্র ভারতে রেল যোগাযোগের পারকল্পনা গৃহাত হলে প্রথম ধাপে কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া রেলপথে ১৮৬২ সালের ২৭ নভেম্বর ট্রেন যোগাযোগ চালু হয় ৷ সেই সুবাদে পশ্চিমে (মহেরপুর এবং পুবে ঝিনাইদহ মহকুমার সাথে সংযোগের জন্য চুয়াডাঙ্গা গ্রামের পুবপ্রান্তে রেলস্টেশন স্থাপন জরুরি হয়ে পড়ে,  ফলে আজ পাড়া-গাঁ চুয়াডাঙ্গায় রাতারাতি কালুপোল থেকে থানা এবং দামুডহুদা থেকে ১৮৬০ সালে চালু হওয়া মহকুমা সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হয়৷ নিতান্তই অজ পাড়া-গাঁ চুয়াডাঙ্গড়া গ্রামটি অতিদ্রুত অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য… দোকান-পাটে সজ্জিত হয়ে শহর হিসেবে নবরূপে আত্মপ্রকাশ করে।

১৮৮৬২ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে চুয়াডঙ্গো সদর, আলমডাঙ্গা, দামুডহুদা ও জীবননগর থানার সমন্বয়ে নদীয়া জেলার অধীন চুয়াডাঙ্গা মহকুমা হিসাবে গঠিত হয় l ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে নদীয়া জেলাকে দুইভাগ করে মহেরপুর মহকুমার করিমপুর ও শিকারপুর দুটি থানা কৃষ্ণনগর মহকুমার সাথে যুক্ত করে রানাঘাট মহকুমা নিয়ে নদীয়া জেলা পশ্চিমবঙ্গে এবং অবশিষ্ট গাংনী ও মহেরপুর এই দুটি থানা নিয়ে গঠিত (মহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া) মহকুমা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে নবগঠিত কুষ্টিয়া জেলার জন্য হয় ৷ ফলে একই নদীয়া জেলা দুই ভাগ হয়ে দুই দেশের অন্তর্গত হওয়ায় দুই অংশের আধাআধি মানুষ পরস্পর উদ্বাস্তুতে পরিণত হয় I দেশভাগ তাই এ অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনে বয়ে আনে চরম বিডম্বনা এবং এক মহারিপর্যয় I 


১৯৪৭ থেকে নবগঠিত কুষ্টিয়া জেলার সাথে সম্পৃক্ত থেকে কেটে যায় পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর ১৯৮৪ সালে ঢুয়াডাঙ্গা জেলা হিসাবে ঘোষিত হওয়ার ফলে চুয়াডাঙ্গার প্রশাসনিক গুরুত্ব যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব এবং মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ চুয়াডাঙ্গা জেলার মোট আয়তন ১১৭০.৮৭ বর্গ কিলোমিটার ৷ আয়তনের দিক থেকে চুয়াডাঙ্গা বাংলাদেশের ৫৪তম জেলা I মোট জনসংখ্যা ১ ১, ২৯, ০ ১৫ I জেলার মোট উপজেলা ৪টি, চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুডহুদা ও জীবননগর। 

চুয়াডাঙ্গার নামকরণ বা মানচিত্রে এর অবস্থান শক্ত হলেও যুগ যুগ কেটে যাওয়া এই জেলার পরিচিত নেই বললেই চলে। বই-পুস্তকেও দেখা যায়না তেমন কোন ইতিহাসের নিদর্শন। অথচ তৎকালীন সময় মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার আগে  চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এখন এ জেলার  মানুষের প্রাণের দাবি চুয়াডাঙ্গাকে যথাযথ মর্যাদায় ভূষিত করে  জেলাকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে     এ জেলার মানুষকে সম্মানিত করবে।


তথ্যসুত্র: ইন্টারনেট  

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন