শ্রাবণীর স্বপ্ন

২৩ নভেম্বার ২০২১ ০৬:৪২:২৩
শ্রাবণীর স্বপ্ন
হুমায়ূন কবীর

লাল টুকটুকে একটা বেনারসি পরে একদিন শ্রাবণী স্বামীর সাজানো সংসারে এসেছিলো।আজ রক্তাক্ত লাল হৃদয় নিয়ে মতনপুর গ্রামের স্বামীর ঘরহীন বিরান ভিটাটাতে চুপচাপ বসে আছে। একটা ঘর, শুধু একটা ঘর আজ তার কাছে স্বপ্নের উপর স্বপ্ন।

 

ঘর তো দূরের কথা শেষ সম্বল স্বামীর ঘরহীন ফাঁকা ভিটাটাও মনে হয় শ্রাবনী শেষপর্যন্ত  রক্ষা করতে পারবে না । দুটো ছেলেমেয়ে নিয়ে  চরম আতঙ্কের  ভিতর দিয়ে দিন যাচ্ছে তার।

 

আপনজনরা আজ সবচেয়ে বড় শত্রু, বড় চোর, বড় ডাকাত। ভিটাতে গাছ লাগালে ভেঙে দেয়, উপড়ে ফেলে। বাড়ি করতে গেলে কাঁচা দেওয়াল ধাক্কা মেরে ভাঙে। কারো কাছে নালিশ করে লাভ নেই।

 

চিন্তা করতে-করতে শ্রাবণীর কত রাত নির্ঘুম কাটে। রাতের পর রাত ঘুমহীন থাকার কারণে শরীরটা ভেঙে পড়েছে। তার মাথাটা ঠিকমতো কাজ করছে না। সব গুলিয়ে যাচ্ছে। বুক ধড়ফড় করছে। যেকোনো সময় তার স্ট্রোক হতে পারে। এখন একটু পানি দরকার। একঢোক পানি খেতে পারলে হতো। ছেলেটা কখন পানি আনতে গেছে এখনো আসছে না কেনো? এতো দেরি হবে কেনো? এতো দেরি তো হওয়ার কথা না। চারিদিকে আপনজনেরা শত্রু।পানি আনতে যেয়ে ছেলেটা কোনো বিপদে পড়লো নাতো? 

 

শ্রাবণী উঠে দাড়ালো। ছেলেটাকে খুজতে হবে। কিন্তু চোখে সে প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আবার সে বসে পড়লো।

 

পানি খেতে পারলে চোখ পরিষ্কার হয়ে যেতো, মাথাটা আগের মতো কাজ করতো। অনেক কাজ করতে হবে। অনেক কাজ পড়ে আছে।

 

এখন বেলা প্রায় এগারোটা। চৈত্র মাসের সূর্য পৃথিবীকে কড়া মেজাজে শাসন করছে ।মনে হচ্ছে সে মাথার ভিতর ঢুকে বসে আছে। যারা দূর্বল,বাইরে কাজ করে তাদেরকে সে বদমেজাজি অভিভাবকের মতো শাসন করছে। যারা এসির ভিতর আছে তারা উল্টা তাকে শাসন করছে।

 

শ্রাবণী বিশ্বাস দুই বছর বিধবা হয়েছে। স্বামীর ঘরহীন ভিটার জমিতে একটা ঘর বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে, গামছা পেতে ঘাসের উপর বসে বদমেজাজি সূর্যের তাপে ঘামছে আর পানিশূন্য হচ্ছে। এইমুহূর্তে শ্রাবণীর সূর্যের উপর খুব রাগ হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সূর্যটা এই রাষ্ট্রব্যবস্থার মতোই; দূর্বলকে আরো দূর্বল করে দিতে পারে। শক্তিশালীর সে কিছুই করতে পারে না।

 

ঘর তৈরি করার জন্য সে ইঁট-বালু আনে, রাতে চুরি হয়ে যায়। চোরে চুরি করে না, করে নিজের লোকে দেবর,ননদ এরা। বোঝা যায়, ধরা যায় না। এদের সাথে সম্পর্ক রেখে না চললে এখানে ঘর করতে পারলেও টিকে থাকা যাবে না। বাধ্য হয়ে চোর আত্মীয়র সাথে সম্পর্ক রেখে চলতে হয়। শ্রাবণী তা-ই চলে।

 

শ্রাবণীর মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।আগেও ছিলো অল্প অল্প, ইদানিং যন্ত্রণাটা তীব্র হচ্ছে।শেষে স্বামীর মতো ব্রেনক্যান্সার হবে না তো?

 

একটা গাছের ছায়ার নিচে বসতে পারলে ভালো হতো ।সূর্যটা সরাসরি চোখে লাগছে। তাপ গরম লোহার শলাকার মতো মগজে ঢুকে যাচ্ছে।  কিন্ত এই জমিতে কোনো গাছ নেই। গাছ লাগালে রাতের অন্ধকারে ননদ অথবা দেবর উপড়ে ফেলে। অথচ আইলের দক্ষিণ পাশে ননদ রেনুর পাচিল ঘেরা জমিতে কত গাছগাছালি -আম,জাম,জামরুল,সেগুন, মেহেগিনি;সবরকম গাছে ভরা বাগান। বাগানের শেষে মাছ ভরা পুকুর।আইলের উত্তরে দেবরেরও একই অবস্থা। শ্রাবণীদের জমিটুকু পড়ে আছে,শুধু জমিটুকু। আর দেবর-ননদের জমিতে বিশাল বাড়ি, কতো গাছ,কতো ছায়া। আর শ্রাবণীদের জমিতে বদমেজাজি রোদের হুমকি ধামকি। যত যা-ই হোক শ্রাবণী হাল ছেড়ে দেবে না । এখানে তাকে ঘর করতেই হবে। তার স্বামী জীবনের শেষদিনগুলো নিজের গ্রামে নিজের বাড়িতে কাটাতে চেয়েছিলো। পারেনি। গ্রামে তার ভিটার জমি থাকলেও বাড়ি তো নেই। তা-ই  তার শেষ ইচ্ছে পূর্ণ হয়নি। অনেক কষ্ট অনেক আফসোস নিয়ে মরেছে সে।  আপন ভাইবোনেরা টাকা খরচের ভয়ে কেউ তার  একটা খবর পর্যন্ত  নেয়নি।অথচ একসময় এরা তার কাছ থেকে কতো টাকাপয়সা নিয়েছে।   আর এখন বেঈমানের দল একটা বাড়ি পর্যন্ত করতে দিচ্ছে না, মাঠের জমির ভাগও দিচ্ছে না। বাড়ি করতে দিলে তো তখন মাঠের জমিও ভাগ করে দিতে হবে। দেবর ননদ মিলে তাই শ্রাবণীদের গোপনে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করছে।

 

স্বামীর শেষ ইচ্ছে সে মেটাতে পারেনি কিন্তু নিজের জীবনের বাকি দিনগুলো স্বামীর ভিটায় তার কবর দেখে দেখে কাটাতে চায় । ভিটাটার পাশেই কবর স্থান। তাই শ্রাবণী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যতো বাধায় আসুক এখানে সে বাড়ি বানাবেই।

 

এছাড়া তার কোনো উপায়ও নেই। শহরে তাদের যে বাড়িটা ছিলো স্বামীর চিকিৎসার জন্য তা বিক্রি করতে হয়েছে। এখন সে বাড়ি হারা, স্বামীহারা অসহায়। ছেলেমেয়ে দুটো নিয়ে সে বিক্রি হয়ে যাওয়া নিজ বাড়িতে কিছুদিন আশ্রিতা হয়ে আছে।

 

মেয়েটার বিয়ের কথা চলছে। কিন্তু আশ্রিতার মেয়েকে তো আর ভালো জায়গায় বিয়ে দেওয়া যাবে না। আর নিজেদের তো একটা ঠিকানারও দরকার আছে। স্বামী  বেচে থাকলে কি আর তার এতো চিন্তা করা লাগে?আজ তার শ্বশুর অথবা শাশুড়ি  বেচে থাকলেও তারা এক সন্তানের পরিবারের প্রতি অন্য সন্তানদের নিষ্ঠুরতা মেনে নিতো না। হয়তো এরা এতটা সাহসই পেতো না।জমিজমা মুখেমুখে ভাগ হয়েছে কিন্তু দখলে আছে দুই ভাই-বোন। শ্রাবণীর স্বামী যশোর শহরে ব্যবসা করে জমি কিনে বসবাস শুরু করলে এরা মনে করে ছিলো, ভাই আর কোনোদিন গ্রামেও আসবে না জমিজমার ভাগও নেবে না। হয়তো এদের ভাবাটাই সঠিক হতো কিন্তু অসুস্থতা, মৃত্যু সব হিসেব পাল্টে দিয়েছে। এখন এরা জমিজমার ভাগ তো দিচ্ছেই না আরও অত্যাচার করছে।  কোনোকিছু এরা এখানে হতে দেয় না,দেবে না।

 

ছেলেটা তার চোর ফুপুর বাড়িতে পানি আনতে গেছে। কোনো বিপদ না ঘটে!  ডাকাত দেবরটা হাসতে হাসতে শ্রাবণীর দিকে এগিয়ে আসছে।

 

দেবর সাজেদের হাতে এক বোতল পানি আর একটা প্যাকেট । সে রাস্তার পাশের নিমগাছের পাশদিয়ে নাক টিপে ধরে আসছে।শ্রাবণীর জমিতে ঐ একটা গাছই আছে। গাছের চারপাশে আবর্জনার স্তুপ। দেবর সাজেদ আর তার বোন রেনুকা মিলে ঐ স্তুপ গড়ে তুলেছে।

 

সাজেদ কাছে এসে কষ্ট কষ্ট কণ্ঠে বললো, কখন এসেছো? চোখমুখ শুকনা শুকনা লাগছে। সকালে নাস্তা করেছো? আমার বাসায় গেলে কী হয়? নাও নাস্তা করে নাও। কেন এত সুন্দর দেহটাকে রোদে পুড়িয়ে নষ্ট করছো? আমার বিল্ডিং এ প্রতিটি রুমে এসি লাগানো আছে। যে রুম তোমার ভালো লাগে সেটাই নাও। কেনো অকারণ এতো কষ্ট করছো?  তোমার কষ্ট দেখলে আমার কষ্ট হয়।

 

শ্রাবণী, তুই আমার স্বামীর কতো ছোট। আমি যখন এই বাড়িতে আসি তখন তুই হাই স্কুলে পড়িস। একদিন বেশি মাংসের ঝোল খেয়ে তোর পেটখারাপ হলো, মনে আছে? তুই প্যান্টে পায়খানা করে ফেললি।মা বাড়ি ছিলো না। তোর প্যান্ট আমি ধুতে চাইনি। তোর ভাই রেগে আমাকে একটা থাপ্পড় মেরে নিজে সেই প্যান্ট ধুয়ে দিয়েছিলো। সে মরেছে মাত্র দুইবছর । এখনো তার কবরের মাটি শুকায়নি, তুই আমাকে বিয়ে করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিস। তোরা কী পেয়েছিস? ঘর করার জন্য ইঁট বালু আনি তোরা দুই ভাই-বোন চুরি করে নিস, কেন? বাড়ি করতে দিবি না? বাড়ি না থাকলে আমরা কোথায় দাড়াবো? তোর ভাইপো -ভাইঝি এদের কথা তো একটু ভাবতে পারিস।তোদের মনুষ্যত্ব বলে কিছু কি আছে? নানান প্রলোভন দেখিয়ে একটা দূর্নাম দিতে পারলে তো তোর মনের ইচ্ছে পুরন হয়। তুই যতো চেষ্টায় করিস এই ভিটাতে আমি আমার সন্তানদের জন্য একটা ঠিকানা, একটা বাড়ি আমি বানাবোই।

 

সাজেদ অনেক দিন ধরে লেগে আছে। শ্রাবণী এতো কড়াভাবে, এতো সোজা করে কঠিন কথা কখনো বলেনি।শ্রাবণী যে এভাবে কথা বলতে পারে সাজেদ স্বপ্নেও কখনো তা ভাবে নি।

 

সাজেদের মুখে আজ কোনো কথা নেই। সে একদৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে শেষে চোরের মতো মাথা নিচু করে চলে গেলো।

 

সেদিন সারাদিন বসে থাকলেও ইটের গাড়ি আসলো না। দিনশেষে ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসলো। শ্রাবণীর মনে সাজেদের সাথে বলা কথাগুলো বারবার ঘুরেফিরে আসছে। নিজের দেবরের সাথে এতো উত্তেজিত আচরণ সে এই প্রথম করলো।একটু খারাপ লাগছে আবার ভালোও লাগছে। এর প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটাও একটা বিষয়। সাজেদ লোক খুব সুবিধার নয়। সে চোর,বদমাশ পোষে। গ্রামের ক্ষমতাবান লোকদের সাথে তার সম্পর্কে ভালো। ইটের গাড়ি আসতে সেই হয়তো বাঁধা দিয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস তার ভালো লাগছে, ক্ষমতাবান, ডাকাত সাজেদ, দাপুটে সাজেদ আজ তার সামনে দিয়ে চোরের মতো মাথা নিচুকরে চলে গেছে। তারমানে অন্যায়কারি সোজা- সত্য কথায় ভয় পায়।

 

শ্রাবনীর সোজা  কথায় সাজেদ সত্যই ভয় পেয়েছে। তার যত ক্ষমতাই থাক সদ্য বিধবা বড় ভাবিকে বিয়ে করার কথা মানুষ ভালোভাবে নেবে না। কথাগুলো ভাবি নিজে মুখে যদি গ্রামের লোকদের সাথে বলে বেড়ায় তাহলে মানুষ তাকে ছিছি করবে। ভিত সাজেদ বিষয়টা ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য ভাবতে লাগলো। এমন কিছু করতে হবে যাতে ভাবি লজ্জায় গ্রামে আর না আসে।

 

গ্রামে সে রটিয়ে দিলো শ্রাবণী তাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দিচ্ছে। প্রমাণ হিসেবে একজন সাক্ষীও ম্যানেজ করে ফেললো। কেউ বিশ্বাস করলো, কেউ করলো না। বিশ্বাস করুক নাকরুক তাতে কী? সাজেদের বোন রেনু এই কথার পক্ষে সারা গ্রাম তোলপাড় করে ফেললো। শেষে কথাগুলো শ্রাবণী, শ্রাবণীর ছেলে সজীব, মেয়ে শ্যামলী সবার কানেই পৌছে গেলো।

 

কথার ঢেউ অনেকসময় সমুদ্রের ঢেউ থেকেও মারাত্মক শক্তিশালী হয়। এখন বাড়ি করা তো দূরের কথা শ্রাবণীর সংসারে মুখ দেখানোই কষ্ট হয়ে গেলো।

 

রেনু যশোরের বাসায় এসে দুপুরে খেয়ে গেছে। ছেলে-মেয়ের কানে বিষ ঢেলে গেছে। ওরা মায়ের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেনো ঐ চোরটার কথাই সত্য। মেয়েটা তো কথায় বলছে না। ছেলেটা শুধু খাওয়ার সময় মাকে ডেকে ভাত চাচ্ছে।

 

এখন ওদের কারোর মাথায় বাড়ি করার চিন্তা আর নেই। ছেলে -মেয়েদের আচরণে শ্রাবণী মনের কষ্টে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ ঘরে বসে থাকে। শেষে চোর আর ডাকাতের জয় হলো?

 

বেশ কিছুদিন পর পরিবেশটা একটু থিতিয়ে এলো।

 

সেদিন রাতে এশার নামাজ পড়ে শ্রাবণী নামাজের পাটিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। কেউ তার খোজ নেয়নি। খোজ নিতে এলো তার মৃত স্বামী। সে স্বপ্নে দেখলো তার স্বামী গ্রামের নিমগাছটার মাথায় বসে হাসছে।গাছে অসংখ্য সাদা সাদা ফুল ফুটে আছে। স্বামীর হাসি দেখে শ্রাবণীও হাসছে। হাসতে হাসতেই তার ঘুম ভেঙে গেলো। তখন চারপাশে মসজিদে ফজরের আজান হচ্ছে । শ্রাবণী উঠে নামাজ পড়ে বারান্দায় এসে দাড়ালো। তখনো তার মুখে সেই হাসির রেশ লেগে আছে।

 

সজীব ওজু করে বারান্দায় ঝোলানো গামছায় হাত-মুখ মুছতে এসে দেখলো তার মা রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। মার মুখটা ভোরের স্নিগ্ধ শিশিরের মতো আনন্দে ঝলমল করছে। সজীব হাত-মুখ মোছা ভুলে মায়ের আনন্দে আনন্দিত হয়ে হা করে দাড়িয়ে আছে। কতদিন তার মা হাসে না। বাপের ব্রেইন ক্যান্সার হওয়ার পর থেকে চিকিৎসা, দৌড় ঝাপ,ধারদেনা, টেনশন শেষে বাপের মৃত্যু  -প্রায় পাঁচটা বছর ওদের জীবন এক অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কের ভিতর দিয়ে কাটছে। এর ভিতর আনন্দের কোনো স্থান নেই। সজীব ওর মা-এর কাছে এগিয়ে গেলো।

 

মা, কী হয়েছে তোমার? একা-একা বারান্দায় দাড়িয়ে হাসছো?

 

শ্রাবণী, কিছু হয়নি। তোর বাপ এসেছিলো। স্বপ্নে দেখলাম, সে গ্রামে আমাদের নিমগাছটার মাথায় বসে হাসছে।

 

সজীব, ও, তাই আব্বার হাসি দেখে তুমিও হাসছো?

 

হ্যা।

 

শুধু হাসলো? কিছু বললো না?

 

বলেছে।

 

কী?

 

তুই যা, নামাজ পড়ে আয়। আমি চা বানিয়ে আনি। চা খেতে-খেতে শুনিস। যা, ফজরের ওয়াক্ত বেশি সময় থাকে না।

 

শ্রাবণী তিন কাপ চা বানালো। সজীব বিস্কুট ভেঙে চা দিয়ে ভিজিয়ে খাচ্ছে। ওর বাপেরও এই ভাবে চা-বিস্কুট খাওয়ার অভ্যাস ছিলো। এই ভাবে চা-বিস্কুট খাওয়া শ্রাবণী পছন্দ করতো না। ওর কাছে বিশ্রী লাগতো। এখন খারাপ লাগছে না।ভালো লাগছে, খুব ভালো।ছেলে যে বাপের এই স্বভাবটা পেয়েছে তারজন্য ওর খুব আনন্দ লাগছে। শুধু দেখতে ইচ্ছে করছে। শ্রাবণী ছেলের চা-বিস্কুট খাওয়া   এখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।

 

এক টুকরো ভেজা বিস্কুট মুখে পুরে সজীব জানতে চাইলো, ওমা, আব্বা কী বললো? বলো।

 

শ্রাবণী, নিমগাছটা কেটে ফেলতে বললো।

 

ওদের মাঝে কখন যে শ্যামলি এসে দাড়িয়েছে ওরা খেয়াল করেনি। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে শ্যামলী বললো, আমাকে ডাকলে না কেনো মা?

 

শ্রাবণী, তোর রুমে আলো দেখে মনে করলাম, তুই উঠেছিস,নামাজ পড়ছিস। নানাজ পড়ে চা খেতে আসবি, তাই আর ডাক দেয়নি।

 

শ্যামলি, আসলে তুমি ভাইয়াকে বেশি ভালোবাসো। সেইজন্য আমাকে না ডেকে শুধু ভাইয়াকে চা খাওয়াচ্ছো।

 

শ্রাবণী, চা তোর জন্যও বানিয়েছি। বস, চা খা।

 

চা শেষ করে সজীব বললো, মা, নিমগাছটা দাদার হাতে লাগানো। অনেক বয়সী গাছ। রাস্তার পাশের গাছটা আমাদের বাড়ির একটা চিহ্ন। ওটা কেটো না।

 

শ্যামলীও তার ভাইয়ের পক্ষ নিলো,  ভাইয়া ঠিকই বলেছে মা। দাদার হাতের শেষ স্মৃতিটা তুমি কেটো না। 

 

শ্রাবণী, কিন্তু তোদের বাপ আমাকে নির্দেশ দিয়েছে ।

 

বাপের কথায় ওরা চিন্তায় পড়ে গেলো। শ্যামলী বললো, মা, গাছ বিক্রি করো আর যা করো, তুমি কিন্তু গ্রামে যাবে না। সেদিন রেনু ফুফু এসে অনেক কথা বলে গেছে। তুমি এখান থেকে মোবাইলে কথা বলো। গ্রামে ব্যাপারিদের সাথে কথা বলে গাছ বিক্রি করে দাও। আর যদি গ্রামে যেতেই হয়, ভাইয়া যাক।

 

একটু বেলা হলে শ্রাবণী আর তার ছেলে মোবাইলে চেষ্টা করলো। গাছ বিক্রি হলো না। কেউ কিনতে চায় না। কেউ মারতেও চায় না। সাজিদ বললে হবে, নাহলে হবে না।

 

সজীব বললো, মা, বাদ দাও ছোটো কাকু বেঁচে থাকতে আমরা গ্রামে কিছুই করতে পারবো না। ঘর করতে পারলাম না, একটা গাছ দিয়ে কী হবে?

 

শ্রাবণী, অতো কিছু আমি জানি না। আমার জীবনের বিনিময়ে হলো তোর বাপের আদেশ আমি পালন করবোই। তুই শহরে দেখ, লোক পাবি। শহরে অনেক কাঠ ব্যাবসায়ি আছে, গাছ মারা লোক আছে। এখান থেকে লোক নিয়ে যাবো। তুই যা খবর নে। আচ্ছা চল আমিও যাচ্ছি।

 

শহরে সবধরনের লোক পাওয়া যায়। কাজের লোক, অকাজের লোক, খুনখারাবির লোক - এখানে পয়সা দিলে সব পাওয়া যায়।

 

পরেরদিন ওরা তিনজন গাছ মারা লোক নিয়ে গ্রামে হাজির হলো।

 

সকাল আটটার মতো বাজে। সাজিদ আর নরেন কবিরাজ নিমগাছটার সামনে রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে গল্প করছে। সাজিদ সিগারেট টানছে, নরেন কবিরাজ ছুরি দিয়ে নিমের মেছওয়াক বানাচ্ছে।

 

শ্রাবণী লোকজন নিয়ে তিনচাকার ভ্যান থেকে ওদের সামনেই নামলো। নরেন কবিরাজ বয়স্ক মানুষ, শ্রাবণীর শ্বশুরের বাল্যবন্ধু  -শ্রাবণী তার দিকে এগিয়ে যেয়ে কুশল বিনিময় করলো।

 

শ্রাবণী জানতে চাইলো, কেমন আছেন কবিরাজ কাকা?

 

ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? তোমার মেয়ে তো বিয়ে দেওয়ার মতো হয়েগেছে।

 

হ্যা কাকা। কিন্তু আমার মতো ঘরবাড়িহীন বিধবার মেয়েকে বিয়ে করবে কে?

 

নরেন,

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন