স্বর্ণ কন্যা ইতি

১২ ডিসেম্বার ২০১৯ ১৪:০৩:২৯
স্বর্ণ কন্যা ইতি

আব্দুর রব: চুয়াডাঙ্গার দরিদ্র পরিবারে জন্ম। হোটেল কর্মচারী বাবা ইবাদত আলি তিন মেয়ের মধ্যে তাকেও বিয়ে দেওয়ার সব প্রস্তুতিই সেরে নিয়েছিলেন। বরপক্ষ তাকে পছন্দও করেছিল। বিয়ের সব কথা পাকা হয়ে গেলেও তিনি খুঁজছিল মুক্তির পথ। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে আর্চারির প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পের খবর পেয়েই চম্পট দেন তিনি। বলছি স্বর্ণ কন্য হিসাবে খ্যাত ইতি খাতুনের কথা। এসএ গেমসে একক ও দলীয়ভাবে তিনটি স্বর্ণ পদক পেয়েছেন তিনি। আত্নপ্রত্যায়ী ইতি সংগ্রাম করে সফলতার মুখ দেখেছেন।  

আর স্বর্ণ জয়ে আনন্দে ভাসছে তাঁর নিজ পরিবার ও স্থানীয় জনগণ। চুয়াডাঙ্গা পৌর এলকার বেলগাছি মুসলিমপাড়ার রেলওয়ের খাস ও নিজের সামন্য জমিতে থাকেন তার বাবা ইবাদত আলী। তিন সন্তান ও স্বামী স্ত্রী নিয়ে কষ্টে চলে তার সংসার। মেয়েদের পড়ার খরচ চালানোর মতো কোন অর্থ নেই তার। দারিদ্রতার কারণে বড় মেয়ে আইভি খাতুনের বিয়ে হয় ছোট বেলায়। কিন্তু তা উপেক্ষা করে ইতি খাতুন পড়াশুনা চালিয়ে যায়।

ইতি খাতুন পিএসসি পরীক্ষা দেয় ২০১৫ সালে। তার পর নিজের ইচ্ছায় ২০১৬ সালে ভর্তি হয় চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে। বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন বিভাগ থেকে পুরস্কার পান।

২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশন থেকে দেশব্যাপী আর্চারি খেলোয়ার অনুসন্ধানে কার্যক্রম শুরু করে। চুয়াডাঙ্গায় আর্চারি খেলোয়ার বাছাই কার্যক্রমে প্রায় ৪০ জন ছেলে মেয়ে অংশগ্রহণ করেন। সেখান থেকে প্রাথমিকভাবে ১০ জনকে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তীতে ১০ জনের মধ্যে থেকে ৫ জনকে ঢাকায় উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য ডাকা হয়। কিন্তু বাবা-মা ও বড় দোলাভাই বাদ সাধে ঢাকা যেতে দিতে। তারা বলেন, মেয়েরা খেলাধুলা করে কি করবে? 

তখন জেলা ক্রিড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দার ও বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাকালিন সদস্য সোহেল আকরাম ইতির বাবাকে চুয়াডাঙ্গা স্টেডিয়ামে ডাকেন। তারা ইতির বাবাকে ঢাকায় আর্চারি প্রশিক্ষণে পাঠানোর কথা বলে। বাবা ইবাদত আলী তখনও রাজি হয় না। পরে সম্মতি প্রকাশ করে এবং ইতি আক্তারকে ঢাকাতে পাঠান। সেখানে কয়েক দিন প্রশিক্ষণ নিয়ে ভাল খেলা প্রদর্শন না করতে পারায় তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় চুয়াডাঙ্গায়।

ইতি চুয়াডাঙ্গায় ফিরে এসে দেখা করেন সোহেল আকরামের সাথে। সোহেল আকরাম ইতির বাবার কাছ থেকে তার দায়িত্ব নেন। তিনি ইতিকে আবার ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ইতির। পড়াশুনার পাশাপাশি আর্চারি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন নিয়মিত।

ইতি খাতুন এর আগে আর্চারি খেলতে স্পেন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড সফর করেছে। দেশে জাতীয় পর্যায় ও আর্চারি ফেডারেশনের আয়োজনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করেছেন।

২০১৮ সালে চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করলেও এক বিষয়ে ফেল করেন। ২০১৯ সালে আবারও পরীক্ষা দেন ইতি। পরীক্ষা শেষ করে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় ফিরে যান। নেপালে এসএ গেমসে অংশগ্রহণের জন্য আর্চরি দলের সাথে যান। সেখানে তিনি আর্চারিতে তিনটি ইভেন্টে ৩টি স্বর্ণ পদক লাভ করলেন। 

ইতি খাতুন স্বর্ণ পদক লাভ করায় পরিবার, নিকট আত্নীয় স্বজন ও জেলায় সাধারণ মানুষ আনন্দ প্রকাশ করেন। চুয়াডাঙ্গা ঝিনুক মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেবেকা খাতুন বলেন, ইতি খাতুন প্রতিভাবান একটি মেয়ে। সোহেল আকরাম আর্চারি খেলার জন্য স্কুল থেকে ওকে নিয়ে যান। তাকে বিদ্যালয় থেকে লেখাপড়ার বিষয়ে শিক্ষকরা সব ধরনের সহযোগিতা করতেন। সে স্বর্ণ পাওয়ায় আমরা খুশি।

সোহেল আকরাম জানান, ইতিকে যখন তার ক্রিড়া শিক্ষক আমার কাছে দেয়, বলেন ওর ভেতর অনেক প্রতিভা আছে। ইতি অনেক ভদ্র ও নম্র মেয়ে। ইতি যেদিন ঢাকায় যায় সেদিন থেকে ওকে আমি নিজের মেয়ের মত করে দেখি। ওর কোন অভাব অনটন বুঝতে দেয়নি। ইতিকে বলেছিলাম তুই দেশের জন্য হলেও একটি স্বর্ণ পদক ছিনিয়ে আনবি। আমার ইচ্ছা ইতি একটি দিন দেশের হয়ে অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করবে। বড় বড় তারকাকে পিছনে ফেলে সে স্বর্ণ পদক জয় করেছে। 

জেলা ক্রিড়া সংস্থা সাধারণ সম্পাদক নঈম হাসান জোয়ার্দ্দার জানান, ইতি স্বর্ণ কন্যা। সে বিদেশে দেশের পতাকা উড়িয়েছে। সে এরপর বড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে। তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। 

ইতির বাবা ইবাদত আলি বলেন, মেয়েকে অনেক কষ্টে মানুষ করেছি। দরিদ্রতার কারণে ইতিকে ছোট বেলায় বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছিলাম কারণ মেয়েকে পড়াশুনা করানোর মত ক্ষমতা ছিলনা। ওর শখ পূরণ করার মত ক্ষমতা আমার ছিলনা। নঈম মামা ও সোহেল মামা আমার মেয়ের দায়িত্ব নিয়েছে। 

জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, শুনেছি ইতি এসএ গেমসে তিনটি স্বর্ণ পদক পেয়েছে। ইতি জেলার জন্য সুনাম বয়ে এনেছে। তাকে ও পরিবারকে সবধরনের সহযোগিতা করা হবে।







মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন