"পরিশ্রমে ধন আনে, পুণ্যে আনে সুখ"

০৯ জানুয়ারী ২০২০ ১৮:৪৯:৪৯
"পরিশ্রমে ধন আনে, পুণ্যে আনে সুখ"

পিয়াস গ্রুপ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির কর্ণধার আসাদুজ্জামান আকুলের জন্ম তার পৈত্রিক নিবাস ঐতিহাসিক মেহেরপুর জেলার আমঝুপি গ্রামে। জন্ম আমঝুপিতে হলেও শৈশবে তাকে আমঝুপিতে আটকে রাখা যায়নি। পার্শ্ববর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের দেহাটি গ্রামে নানা মো. ইয়াকুব আলির কাছে তার দুরন্ত শৈশব ও বেড়ে ওঠা।

তার শিক্ষাজীবনের শুরুও হয় সেখানেই। দেহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ি। পর্যায়ক্রমে আন্দুলবাড়ীয়া বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এস এস সি ও  জীবননগর ডিগ্রী কলেজ হতে এইচ এস সি পাশ করেন তিনি। তারপর তাদের আদি ব্যবস্যায় যোগ দেন তিনি। সর্বপ্রথম গড়ে তোলেন পিয়াস ব্রিকস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তবে সম্মুখীন হতে হয়েছে বিভিন্ন প্রতিকুলতার। বার বার হেরে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়েছেন। সেইসব প্রতিকুলতাকে পরিশ্রমের মাধ্যমে বিদায় জানিয়ে একে একে গড়ে তুলেছেন পিয়াস গ্রুপ প্রাইভেট লিমিটেড এর আওতায় ছয় ছয়টি প্রতিষ্ঠান।

তিনি তার জন্ম, শৈশব, শিক্ষাজীবন, সফলতার গল্পসহ নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন ইতিহাস প্রতিদিনের সাথে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জীবননগর প্রতিনিধি এম এইচ সাগর এবং সহযোগিতায় এম এইচ সবুজ। 


এম এইচ সাগর:  আপনার জন্মস্থান কোথায়?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমার জন্মস্থান মেহেরপুর জেলার আমঝুপি গ্রামে।


এম এইচ সাগর: আপনার শৈশব কোথায় কেটেছে?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমার শৈশব কেটেছে চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার দেহাটি গ্রামে।


এম এইচ সাগর:  আপনি আপনার জন্মস্থান থেকে এখানে কিভাবে এলেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমার জন্মটা হয়েছিল যুদ্ধের সময়। তখন আমার বাবা-মা স্বপরিবারে এখানে অর্থাৎ আমার নানার বাড়ি দেহাটি গ্রাম চলে আসে।


এম এইচ সাগর: লেখাপড়া করেছেন কোথায়?

আসাদুজ্জামান আকুল: দেহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আমার শিক্ষাজীবন শুরু। তারপর আন্দুলবাড়ীয়া বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এস এস সি পাশ করি এবং পরে জীবননগর ডিগ্রী কলেজ হতে এইচ এস সি পাশ করি।


এম এইচ সাগর: ব্যবসা জীবনে কিভাবে এলেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমঝুপিতে আমার দাদার টালিখোলা ছিলো। তখন তো ইট-ভাটা ছিলো না। তারপরে বাবা ইটভাটা গড়ে তোলেন। সেখান থেকে আমার আগ্রহ জন্মায় ভাটা গড়ে তোলার এবং একপর্যায়ে আমি পুরোপুরি ব্যবসার মধ্যে ঢুকে পড়ি।  


এম এইচ সাগর: আপনার সফলতার গল্প জানতে চাই!

আসাদুজ্জামান আকুল:  আমার দাদা ছিল আমঝুপি ইউনিয়নের একাধারে চল্লিশ বছরের  নির্বাচিত চেয়ারম্যান। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার পুরো পরিবার আমার নানার বাড়ি দেহাটি চলে আসে। আর সেই সুবাদেই আমার এখানেই সবকিছুর শুরু হয়েছে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আমার বাবা মা আমাদের নিজ গ্রাম আমঝুপিতে ফিরে যান, কিন্তু আমি এখানেই থেকে যায়। এজন্য আমার শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনকাল এখানেই আমার নানার বাড়িতে অতিবাহিত হয়।

তখন এই এলাকা ছিল অনেকটা জনমানবশূণ্য দুর্গম এলাকা। প্রায়সময়ই ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করতো। আমার নানা সাধারণত কৃষি কাজ করত। তখন এই এলাকা কৃষি প্রধান অঞ্চল  হিসেবেই বিবেচিত ছিল।

ছোট বেলা থেকেই আমার ইচ্ছে ছিল ব্যবসা করার।  হঠাৎ আমার ইচ্ছা পোষণ হলো ব্যবসা শুরু করার। তারই ধারাবাহিকতায়  পড়া-লেখার পাশাপাশি আমি সর্বপ্রথম রাইচ মিল এর (ধান ভানা) ব্যবসা শুরু করি। কিন্তু খুব একটা লাভজনক ব্যবসা না হওয়ায় ঐ ব্যবসা ছেড়ে কীটনাশকের ব্যবসা আরম্ভ করি।  কিন্তু এই ব্যবসাতেও ভাগ্য আমার সহায় হলো না। ব্যবসা শুরুর কিছু দিনের মাথায় দোকানে চুরি হলো। তখন মন খারাপ হয়ে গেল এবং সে ব্যবসাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। আর তখনই আমার মাথায় এলো ইট-ভাটা করার পরিকল্পনা। কিন্তু এটাতেও অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে গেলাম; কেননা এটা স্বল্প পুজির ব্যবসা ছিল না তাছাড়া আমি তখন খুবি ছোট ছিলাম। তখন আমি মাত্র নবম শ্রেনীতে পড়তাম। বয়স আর তখন কত হবে; এই ১৬ বছরের মতো। তাই পরিবার থেকেও কোন সহায়তা পায়নি। কিন্তু হাল ছাড়তে আমি রাজী নই। তাই আমি স্বল্প পুজির লাভজনক কলা  চাষ করতে শুরু করলাম এবং ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) হাজার টাকা লাভ করতে সক্ষম হলাম। ইতোমধ্যে আমার এস এস সি পরিক্ষাও শুরু হয়ে গেল। পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম এবং ভাল ফলাফল নিয়ে উত্তীর্ণ হলাম। ভর্তিও হলাম কলেজে। কিন্তু আমার নেশা  তখনও ইট-ভাটার ব্যবসা করা।

তখন আমি নানার সহযোগিতায় আমার বর্তমান বাসভবনের পাশে নিজস্ব দুই বিঘা এবং বিপুল ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে অন্যদের থেকে ১০ বিঘা জমি নিয়ে প্রায় ১২ বিঘা জমির উপর ইট বাবদ ৩-৪ লক্ষ  টাকা গ্রহণ করে ভাটার কার্যক্রম শুরু করি। প্রথম বছরেই বিশাল লসের খপ্পরে পড়ি।

পরের বছর আবার নতুন করে শুরু করলাম, কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার জন্য অর্থের ব্যপক অভাব দেখা দিলো। তাই আমি একটা অংশীদার নিতে বাধ্য হলাম। কিন্তু সেও অল্প কিছু অর্থ দেওয়ার পরে অপরাগতা স্বীকার করলো। তাই তাকে আর রাখা সম্ভব হল না। পরে আরো অনেক অংশীদার নিয়ে কাজ করেছি, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি। আমি নিজে অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠানটি একটা মোটামুটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হলাম। কিন্তু আবারো একটা অনাকাঙ্ক্ষিত মিথ্যা মামলার ১নং আসামি হয়ে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো।  

এরপর ২০০৪ সালে অনেকটা কৌশলী হয়ে একা একা কঠোর পরিশ্রম করে  ভাগ্য বদলের চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি বিশ্বাস করি সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে শক্তি ও বুদ্ধিমত্তা প্রদান করেছেন পরিশ্রম করার জন্য। বিনা পরিশ্রমে কোনো কিছুই অর্জন করা যায় না। কথায় বলে, "পরিশ্রমে ধন আনে,পুণ্যে আনে সুখ"। এরপর আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সৃষ্টিকর্তা আমার পরিশ্রমের উত্তম বিনিময় আমাকে প্রদান করেছেন। একে একে গড়ে তুলেছি ছয় ছয়টি প্রতিষ্ঠান।


এম এইচ সাগর: আপনার প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম যদি বলতেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমার কোম্পানির নাম পিয়াস গ্রুপ প্রাইভেট লিমিটেড; পিয়াস ব্রিকস, পিয়াস ফিলিং ষ্টেশন, পিয়াস এন্টারপ্রাইজ, তৃপ্তি ট্রেডিং করপোরেশন, মেহেরপুরে অবস্থিত হাজী আয়েশা আকবর শপিং কমপ্লেক্স এবং নির্মানাধীন তৃপ্তি এগ্রো ফুড।   


এম এইচ সাগর: আপনার কোম্পানিতে মোট কতজন কর্মরত আছে?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমার প্রতিষ্ঠানে মাসিক বেতনভুক্ত ৫০ জন এবং প্রতিদিনের শ্রমিকসহ ৩০০ জনেরও বেশি কর্মরত আছে।


এম এইচ সাগর:  আপনার প্রতিষ্ঠান কতটুকু জায়গার উপর দাঁড়িয়ে আছে?

আসাদুজ্জামান আকুল: প্রায় ২০ একর জমির উপর আমার এই প্রতিষ্ঠান অবস্থিত এছাড়াও শপিং কমপ্লেক্স ২০শতক জমির উপর অবস্থিত।


এম এইচ সাগর: অটো রাইচ মিলটির নির্মান কাজ কবে শুরু করেছিলেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করি। 


এম এইচ সাগর: আপনি এমন একটা প্রজেক্ট করতে আগ্রহী হলেন কেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমি প্রথমে প্লাষ্টিক ইন্ডাস্ট্রি করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পরে আমি চিন্তা করলাম এডভেঞ্চার কিছু করতে হবে। যেটা সব সিজনে চালু থাকবে; পাশাপাশি মানুষের মৌলিক চাহিদার অভাবও পূরণ হবে। যেহেতু আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য ভাত ফলে মানুষের নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা পূরণের লক্ষে আমার এমন ব্যবসার উদ্যোগ গ্রহণ করা।


এম এইচ সাগর: আপনার চলমান প্রজেক্টের  কাজের অগ্রগতি কি?

আসাদুজ্জামান আকুল: ৯০ শতাংশ কাজ শেষের দিকে, আশা করছি চলতি মাস থেকেই উৎপাদন শুরু করতে সক্ষম হবো।


এম এইচ সাগর: চলমান প্রতিষ্ঠানটির নির্মান ব্যায় কত?

আসাদুজ্জামান আকুল: ১৫ কোটি টাকা ব্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি নির্মান হচ্ছে।


এম এইচ সাগর: ভবিষ্যতে কি আর কোন প্রতিষ্ঠান করার পরিকল্পনা  আছে?

আসাদুজ্জামান আকুল: ব্যবসায় যদি সফলতা অর্জন করতে পারি তাহলে ওটাকেই  ভবিষ্যতে বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এছাড়াও ফিড প্রজেক্ট গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আছে।


এম এইচ সাগর: এই প্রতিষ্ঠানে কত জনের মত শ্রমিক কর্মরত থাকবে?

আসাদুজ্জামান আকুল: সব মিলিয়ে ১০০ জনের মত।


এম এইচ সাগর: অর্থনীতিতে আপনার প্রতিষ্ঠান কতটুকু ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: চাষী এবং ক্রেতা ন্যায্য মূল্যে খাদ্যশস্য বিক্রয় এবং ক্রয় করতে পারবে। এজন্য কৃষকদের হাটে-বাজারে যাতায়ার খরচসহ বিভিন্ন খরচ কমবে। এছাড়াও দেশের খাদ্যের ঘাটতি নিরসন করে দেশের বাহিরে খাদ্যশস্য রপ্তানির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রসার লাভ করতে আমার প্রতিষ্ঠান বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।


এম এইচ সাগর: যে উদ্যেশ্যে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সেটি বাস্তবায়নে কতটুকু সফল হয়েছেন বলে মনে করছেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: আলহামদুলিল্লাহ্ আমার উদ্যেশ্যের যথাযথ সফলতা পেয়েছি।


এম এইচ সাগর: বর্তমান সরকার কতটুকু ব্যবসা বান্ধব বলে আপনি মনে করেন; এছাড়া সরকারের উদ্যেশ্যে যদি কিছু বলতেন?

আসাদুজ্জামান আকুল: আমি প্রথমেই সরকারকে ধন্যবাদ জানায় বিদ্যুৎ খাতে ব্যপক উন্নতির জন্য। বিদ্যুৎ একটি অতি প্রয়োজনীয় শক্তি। বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের কলকারখানা অচল প্রায়। সেক্ষেত্রে সরকার এটা একটি বড় ভূমিকা বহন করে। পাশাপাশি সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অরাজকতা বন্ধে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করায় আমরা সঠিক নিয়ম মেনে সরকারের নির্ধারিত কর পরিশোধ করে অবাধে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছি। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অভিনন্দন।

মন্তব্য

এই নিবন্ধটি জন্য কোন মন্তব্য নেই.

আপনার মন্তব্য লিখুন